এক জোড়া কবিতা

মা
।। এবিএম সোহেল রশিদ।।
.
স্বর্গ রহস্যের উৎসারিত সুরে মধুর চিৎকার
যন্ত্রণার জোয়ারকে ভেজায় মমতা মাখা বৃষ্টি
একবিন্দুতে স্থির সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের দৃষ্টি
মুষ্টিবদ্ধ হাত সোচ্চার ‘এ আমার অধিকার’।
.
গভীরে প্রোথিত শিকড়ে নাড়ির নিগূঢ় সম্পর্ক
শত কাটাকুটি শত ভাগাভাগিতেও বাঁধন অটুট
সময় নদীর বাঁকে বিজয়োল্লাসে নেই বিতর্ক
এক চুমুকে আজীবনের ঋণে অস্তিত্বের চিরকুট।
.
প্রথম দর্শনে, প্রথম খাবারে, প্রথম সোহাগে
সব প্রথমার একমাত্র আশ্রয়ে
সবচেয়ে নিরাপদ শান্তির কোণ—
প্রথম বর্ষণে, প্রথম আবদারে, প্রথম অনুরাগে
অপত্যয় স্নেহে মমতার প্রশ্রয়ে
মধুময় উচ্চারণ ‘ বাবা শোন্’।
.
সম্বর্ধনার আসরে বিশ্বসেরা সব মহীয়সী
সাফল্য-মঞ্চে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান
সেখানেও গৌরবান্বিত নারী, আমার জন্মদাত্রী
ধরণীর সব মিছিলেই তিনি থাকেন আগুয়ান।
.
এখনও আলোর বাতায়নে উড়াও স্নেহের আঁচল
এখনও প্রতিটি সংকটে তুমিই হও নিরবচ্ছিন্ন সেতু
এখনও কষ্ট-পাহাড় স্নেহ-মমতায় ঢাকো অহেতু
এখনও সুখের শেষ আশ্রয়স্থল; তোমার পা যুগল।
.
মুক-বধির জটিল সমাজে
পূজনীয় গ্রীকদেবী রিয়া কিংবা সিবিলি
আর অ্যানম জারাফসের নরম কণ্ঠে
আধুনিকতা গুমরে কাঁদে নিরিবিলি

.
আমি আবার শোনাতে চাই সেই প্রথম চিৎকার
যেই শব্দে এই ধরার আকাশ-বাতাস ছিল নির্বিকার
যে সুরে এখনও পাই স্বর্গীয় সুখ
ভিজায় খরায় পোড়া আমার বুক
বিশ্বাস-সীমানায় দাঁড়িয়ে
আগমনী ঘণ্টা বাজিয়ে
চারিদিকে স্নেহের মায়াবী আলোড়ন
উচ্চকণ্ঠে মন-কাবায় সেই মধুর উচ্চারণ।
.
কেঁপে উঠে আমার একান্ত আকাশ
নেচে উঠে হৃদয়ে লালিত সুখ-বাতাস
দুয়ারে কড়া নাড়ে বিশ্বাস
দৌড়ে পালায় দীর্ঘশ্বাস
ভ্রূণ থেকে বর্তমান
চেয়ে দেখি বেঁচে থাকার খতিয়ান
এখনও চোখে ভাসে
বুক- নদী মুচকি হাসে
সেনহ-মমতা কেঁদে উঠে
জন্ম স্বাদের সেই ঠোঁটে
আমি ডাকি
বার বার ডাকি
মা
মা
মা আ আ আ

.

আমার মা আত্মার আত্মা
।। এবিএম সোহেল রশিদ।।
.
বৃষ্টি ভেঁজা চোখ, খুঁজছে কোথায় সুখ
অন্ধকার থেকে আলোর পথে, দীপ্ত শপথে
টেনে অর্থনীতির ঘানি, মুছবে অভাবের গ্লানি
ছেঁড়া আঁচলে লাগাতে জোরা, নিয়তি অধরা
তবু মমতার সুঁইসুতোয়, করছেন দুঃখকে জয়
দূর করেছেন ভয়, নিজেকে করেছেন দুর্জয়।
.
ক্ষুধাময় সময়ে সবই গদ্যময়, অজানা নয়
ভাতের হাড়িতে ধুকপুক, বুকে সন্তানের মুখ
এভাবেই চলছিল ধুঁকে ধুঁকে তার জীবনগাড়ি
পারবে কি জিততে যুদ্ধরত এ সংগ্রামী নারী।
.
প্রতিদিন ভোরে রাজপথ ধরে, ছুটছেন তিনি
অনাথ শিশুদের কাছে যেন জন্মান্তরের ঋণী
ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই, তবুও হাঁটছেন
দুমুঠো অন্ন জোগাড়ে দিনরাত ঘামে ভাসছেন।
.
বেলা শেষে, সবার পাতে, মায়াবি হাতে
দিচ্ছেন তুলে, ক্ষুধা মেটাতে, মজাদার খাবার
খাচ্ছে চেটেপুটে, সকাল দুপুর কিংবা রাতে
সন্তানের পেটপূর্তিতে সুখী অন্তরাত্মা তার।
.
দেখেছ কখনো তাকিয়ে, খাচ্ছেন তিনি কী লুকিয়ে একমুঠো ভাতের জলে, আধপোড়া মরিচ ডলে
কাটান অনেক অনাহারী রাত, জীবনের সংঘাত।
.
পৃথিবীর নিঃস্বার্থ ঝড়ে , নিজেকে উজাড় করে
সর্বস্ব যিনি বিলান, তিনিই আমার মমতময়ী মা
যার তুলনা সৃষ্টির জগতে শ্রষ্টাই রাখলেন না।
.
পোশাকি সমাজে, সভ্যতার প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে
কৃত্রিম ভালবাসার বিধান, দিতে পারেনি সমাধান
পাশ্চাত্য রীতিনীতি জানি না, 'মা দিবস' মানি না
প্রতিদিন হোক মায়ের, প্রতিদিন হোক স্নেহের
শরীর দেখ খুঁড়ে, মা আছেন অস্তিত্ব জুড়ে
আমার মা আত্নার আত্মা, স্নেহময় শান্তির ছায়াতল
আমার কাছে এ পৃথিবী আমার মায়েরই আঁচল।